চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৮

বন্দরনগরীর পাতি সন্ত্রাসী ‘পিচ্চি হানিফ’

প্রকাশ: ২০১৮-০৫-০৩ ০৯:৪৩:২১ || আপডেট: ২০১৮-০৫-০৩ ০৯:৪৫:২৬

নাম মাইনুদ্দিন হানিফ। কিন্তু সবাই তাকে পিচ্চি হানিফ নামেই চেনে। একসময় এলাকায় ‘পাতি সন্ত্রাসী’ ও ‘রংবাজ’ হিসেবেই পরিচিত ছিল এই হানিফ। জড়িত ছিল দোকানপাটে চাঁদাবাজিসহ ছোটখাটো অপরাধে। সেদিনের সেই পাতি সন্ত্রাসীই এখন পুরোদস্তুর খুনি-সন্ত্রাসী! শ্যামলা, লম্বা ও হালকা গড়নের যুব বয়সী এই সন্ত্রাসী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে চট্টগ্রাম নগরীর গুরুত্বপূর্ণ টাইগারপাস, সিআরবি, ওয়াসা মোড়, লালখান বাজার, ইস্পাহানি মোড়, হাই লেভেল রোড, চানমারি বাজারসহ আশপাশের এলাকা। প্রকাশ্যে চলছে তার চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী। কাঁচাবাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রিকশার মালিক, দোকানদার- রেহাই পাচ্ছেন না কেউ। সর্বশেষ চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের সহসাধারণ সম্পাদক সুদীপ্ত ও যুবলীগ কর্মী মো. শরীফ হত্যাকাণ্ডের পর বড় দাগে আলোচনায় উঠে আসে হানিফের নাম।

এলাকার ‘বড় ভাই’ হিসেবে পরিচিত এক আওয়ামী লীগ নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বেপরোয়া এই পিচ্চি হানিফ। এই সন্ত্রাসী একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ পুলিশ বলছে, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!

এ ব্যাপারে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম বলেন, হানিফকে গ্রেফতারে সব ধরনের চেষ্টা চলছে। শিগগির সে ধরা পড়বে। তিনি বলেন, হানিফ খুনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তার অপরাধের বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। সুদীপ্ত হত্যাকাণ্ডের পর থেকে পলাতক থাকায় তাকে গ্রেফতার করা যায়নি। তবে সহসাই সে পুলিশের জালে ধরা পড়বে।

প্রতিদিন সকালে বাজার জমে ওঠে হাই লেভেল রোডের চানমারি এলাকায়। এলাকার নামের সঙ্গে মিল রেখে এখানে গড়ে উঠেছে ‘চানমারি বাজার’। বাজারে বসে মাছ-মাংস ও শাকসবজির শ’খানেক দোকান। একটি-দুটি করে দোকান বসতে বসতে এখন রীতিমতো পরিপূর্ণ বাজারে পরিণত হয়েছে। আগে কাউকে কোনো ভাড়া দিতে হতো না। কিন্তু দেড় বছর ধরে দোকানদারদের কাছ থেকে প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে চাঁদা তোলে হানিফের লোকজন। রাস্তার ধারে গড়ে ওঠা এই বাজারে নতুন কোনো দোকান করতে চাইলে দিতে হয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা।

শুধু চানমারি বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীই নন, ব্যাটারি রিকশা মালিক, অটোরিকশা চালক, দোকানদার- কেউই হানিফের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। তার দলের বখাটে সদস্যদের উৎপাতের শিকার স্কুল-কলেজপড়ূয়া মেয়েরাও। হানিফের প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করছে স্থানীয় ওয়াসিম, বাবুল, মহিউদ্দিন, ইউসুফ ওরফে গাঁজা ইউসুফ, স্বপনসহ আরও কয়েকজন। সম্প্রতি ওয়াসা মোড়, লালখান বাজার, ইস্পাহানি মোড়, হাই লেভেল রোড ও চানমারি বাজার এলাকায় সরেজমিনে খবর নিয়ে হানিফের বিভিন্ন অপকর্মের চিত্র পাওয়া যায়।

অনেক আগেই নগরীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু বিভিন্ন ঘুপচি ও শাখা রোডে চলাচল করে অনেক ব্যাটারি রিকশা। এভাবে ইস্পাহানি মোড়, হাই লেভেল রোড ও ওয়াসা মোড় থেকেও শতাধিক ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে। প্রতি রিকশা থেকে প্রতিদিন ৫০ টাকা করে চাঁদা নিয়ে থাকে হানিফ।

মো. সুমন নামের এক ব্যাটারি রিকশার মালিক জানিয়েছেন, তার চারটি ব্যাটারি রিকশা রয়েছে। এগুলো চালালে প্রতি রিকশায় সপ্তাহে ২০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। এলাকার ছেলেরা এই টাকা নিয়ে যায়। তবে কাকে এই চাঁদা দিতে হয়- তার নাম মুখে নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। ইস্পাহানি মোড়ে ফুটপাতের বিভিন্ন দোকানে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে প্রতিদিন ১০০ টাকা করে আদায় করা হয়। হানিফের ছোট ভাই ওয়াসিম এই টাকা নিয়ে যায়।

ইস্পাহানি মোড় এলাকার মোবাইল ফোনের দোকানদার জানান, হানিফ নামের এক যুবলীগ নেতা বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছে। তার দলের লোকজন প্রতিদিন ১০০ টাকা করে নিয়ে যায়। এ ধরনের প্রায় ২৫টি দোকান থেকে টাকা আদায় করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, মতিঝর্ণা এলাকার নব যুব গোষ্ঠী ক্লাবে রাতভর চলে মদ-জুয়ার আসর। এখান থেকে নিয়ন্ত্রণ হয় যাবতীয় অপকর্ম। স্থানীয় বাঘঘোনা এলাকায় জায়গা দখল করতে গেলে হানিফের নামে একটি মামলা হয়। খুলশী থানায়ও তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এলাকার হাই লেভেল রোডে যুব সংঘ নামে আরও একটি ক্লাব রয়েছে। সেখানেও চলে নানা অপকর্ম।

হানিফের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চান্দিনার আটচাইল গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই চট্টগ্রাম নগরীর মতিঝর্ণা এলাকায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করে আসছে। হানিফের বাবার নাম আবু তাহের। তিনি একসময় রিকশা চালাতেন। হানিফ দুটি বিয়ে করেছে। মতিঝর্ণা এলাকায় হিন্দু মেয়েকে তুলে নিয়ে বিয়ে করে সে। এ কারণে মেয়েটির পরিবারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছিল।

নগর ছাত্রলীগের সহসাধারণ সম্পাদক সুদীপ্ত হত্যা ও যুবলীগ কর্মী মো. শরীফ ওরফে টেম্পো শরীফ হত্যা মামলার অন্যতম এজাহারভুক্ত আসামি হানিফ। পুলিশ এই সন্ত্রাসীকে খুঁজে পাচ্ছে না বলে দাবি করলেও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে।

গত ১২ এপ্রিল নগরীর লালখান বাজার মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদকালে পুলিশের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমে বাধা দেয় হানিফ। উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে ‘ফিল্মি কায়দায়’ দলবল নিয়ে হাজির হয় সে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত রাখতে বাধ্য হন বলে সমকালকে নিশ্চিত করেন জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল মনসুর। বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে কথা বলতে হানিফের মুঠোফোনে চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। এলাকায় গিয়েও দেখা মেলেনি তার।

সিএমপির সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালি অঞ্চল) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, খুনে জড়িত মাইনুদ্দিন হানিফকে ধরা গেলে কার নির্দেশে, কেন সুদীপ্ত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে- তা বেরিয়ে আসবে। এ জন্য তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

সূত্র : সমকাল

Leave a Reply

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

May 2018
S M T W T F S
« Apr   Jun »
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
%d bloggers like this: