চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০১৯

চট্টগ্রামে বাড়ছে কিশোর গ্যাং, ছড়াচ্ছে আতংক

প্রকাশ: ২০১৯-০৫-২১ ২৩:৫৬:৫২ || আপডেট: ২০১৯-০৫-২১ ২৩:৫৬:৫২

পরনে টি-শার্ট, জিন্স প্যান্ট। কখনো চোখে সানগ্লাস। কখনো চুলে অভিনব স্টাইল। রাস্তায়, ফুটপাথে, মাঠে বসে জমিয়ে আড্ডা দেয় তারা। সিগারেট টানে। উচ্চ স্বরে গান করে। হিন্দি, ইংরেজি,বাংলা গান। এভাবেই গড়ে উঠছে এক একটি গ্যাং। উঠতি বয়সি এক ধরনের কিশোররাই তৈরি করছে গ্যাং কালচার। মূলত স্কুল কলেজের শিক্ষর্থীদের দলে টেনে গ্রুপ তৈরি করে কথিত রাজনৈতিক বড় ভাইরা। পরে তাদের ব্যবহার করা হয় এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, ইভটিজিং, ছিনতাই, চাঁদাবাজি সহ নানা অপকর্মে। এসব গ্যাং কালচারে বাদ যাচ্ছে না মানুষ হত্যার মত নৃশংস অপরাধও।

মূলত গ্যাং কালচারের মাধ্যমেই বাড়ছে কিশোর অপরাধ। বেপরোয়া এই গ্যাং কালচার জনমনে ছড়াচ্ছে আতংক।
চট্টগ্রাম শহরে রয়েছে অন্তত অর্ধশত কিশোর গ্যাং। দিনভর বখাটেপনা, আড্ডাই তাদের কাজ। চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার,গনি বেকারি, জামাল খান, কাপাসগোলা, মেডিকেল হোস্টেল, জিইসি , সিআরবি, চান্দগাঁও শমসের পাড়া, ফরিদের পাড়া, আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনি, সিডিএ, হালিশহর, বন্দর কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের সরব উপস্থিতি। মাদক, ডিজে পার্টি ও চুরি-ছিনতাই নিয়ে ব্যস্ত থাকে এই কিশোররা। এমনকি ঘটাচ্ছে মানুষ খুনের মতো ঘটনা।
বিভিন্ন সময় আটক হওয়া কিশোরদের তথ্যমতে বেরিয়ে আসছে কিশোর গ্যাং এর ভয়াবহ চিত্র।

চট্টগ্রামে মাদকের দ্রুত বিস্তার ঘটছে। মাদক ব্যবসা ও সেবনকেন্দ্রিক হত্যাকাণ্ড বাড়ছে আশংকাজনক হারে। চলতি বছরে সাড়ে চারমাসে খুন হয়েছে অন্তত ৪৫। এ রমজানেই খুন হয়েছে ৯জন। এর আগে গত এক মাসে মাদকাসক্তের হাতে খুন হয়েছে ছয়জন।

অন্যদিকে, মাদককে ক্ষেন্দ্র করে নগরের কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ বেড়ে গেছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত এ কিশোর গ্যাং। হত্যাকাণ্ড ছাড়াও মাদকদ্রব্য সেবন এবং বিক্রিতে জড়িয়ে যাচ্ছে এসব কিশোর গ্যাংস্টারদের কেউ কেউ। কিশোর গ্যাংস্টারদের অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারাও।

গত এক বছরের র‌্যাবের পরিসংখ্যান অনুযায়ী,বন্দুকযুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায় ১৭, ফেনী জেলায় ৮, কক্সবাজারে ২১ এবং বান্দরবানে ১।

এদিকে গত মাসে মাদকের প্রধান আস্তানা ‘বরিশাল কলোনি’ এলাকায় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় তিন মাদক ব্যবসায়ী। র‌্যাবের সূত্র অনুযায়ী গত একবছরে নগরে মাদক বিরোধী ২৮৮ অভিযানে গ্রেফতার হয় ৫১৪ এবং বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ২৫।

পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, নগরের প্রায় ৫০০ জায়গায় মাদক বেচাকেনা হয়। এরমধ্যে বরিশাল কলোনি,কদমতলী বাস টার্মিনাল,পাহাড়তলী,টাইগারপাস মাদকের সবচেয়ে বড় বাজার। মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা যেমন বেশি তেমন ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বেশি।এসব মাদকসেবীরাই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তুচ্ছ কারণে খুন করছে।চলতি বছরে খুন হয়েছে প্রায় ৪৫। সর্বশেষ নগরের ডবলমুরিং থানাধীন হাজীপাড়া এলাকায় রাজু আহম্মেদ নামের একজন রিকশাচালককে হত্যা করে একদল কিশোর দল। হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সবাই মাদকসেবী ছিল। মাদকসেবীরা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে খুন করছে।

র‌্যাব-৭ এর সহকারী পুলিশ সুপার মাশকুর রহমান বলেন,নগরের প্রতিদিনই ইয়াবা পাচার হচ্ছে আবার প্রতিদিনই ধরাও পড়ছে। তবে পাচারের তুলনায় জব্দ হচ্ছে কম। গত বছরের ৩ মে থেকে ১৪ মে পর্যন্ত র‌্যাব অভিযান চালিয়ে ২৯ লাখ ৮৯ হাজার ৪০৪ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। এ ছাড়াও গাঁজা, ফেন্সিডিল,দেশি-বিদেশি মদ ও অস্ত্র উদ্ধার হয় ব্যাপক তবে তার সংখ্যা পাচারের চেয়ে কম।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, প্রশাসনের কড়াকড়ি আরোপের কারণে ইয়াবা পাচারকারীরা অভিনব কৌশলে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে চট্টগ্রামে ইয়াবা নিয়ে আসছে। পেটের অভ্যন্তরে, ডাবের মধ্যে, মোটরসাইকেল ও গাড়ির জ্বালানির ট্যাংক, কার্ভাডভ্যানের ভেতরে বিশেষ বাক্সে্ এমনকী পেঁয়াজ রসুন ও কুমড়ার মধ্যে লুকিয়ে নগরে আসছে ইয়াবা। এছাড়াও সম্প্রতি রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাফ নদীতে মাছ ধরার ভান করে ওপারে গিয়ে ইয়াবা নিয়ে আসছে।

র‌্যাব সূত্র জানায়,ঈদ-উল ফিতরকে সামনে রেখে নগরের শপিং মল,বাস স্টেশন,রেল স্টেশন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সাদা পোশাকে র্যা বের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের নিমিত্তে তৎপর থাকবে।বিশেষ করে পতেঙ্গা এলাকায় সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির ফলে সেখানে মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে বসে পড়ে মাদকসেবীদের আড্ডা।এ নিয়েও বিশেষ নজরদারি রাখা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মহানগরের পুলিশ কমিশনার মো.মাহবুবর রহমান বলেন, ইয়াবা যাতে দেশে ঢুকতে না পারে সে ব্যাপারে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে।আর মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আমেনা বেগম বলেন,আশংকাজনক হারে বেড়ে গেছে কিশোর অপরাধ। এগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য রাত আটটার পর বাইরে আড্ডায় পেলেই গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যাওয়ার জন্যও পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মূলত গতবছর ১৬ জানুয়ারি আদনান হত্যার মধ্যদিয়ে চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে আসে কিশোর গ্যাং কালচারের ভয়াবহতা। যার সর্বশেষ শিকার জামাল খান শাহ ওয়ালীউল্লাহ স্কুলের ৮ম শ্রেনীর শিক্ষার্থী তাহমিদ।

জানা যায়, টিফিনের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে তাহমিদকে ছুরিকাঘাত করে তার সমবয়সী কিছু কিশোর। কিশোর গ্যাং যেমন বাড়ছে তেমনি দিন দিন বাড়ছে ভুক্তভোগীর সংখ্যাও। বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিশোর গ্যাং অপরাধের এমন অতিষ্টতাই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেক ভুক্তভোগী।

ফেইসবুক স্ট্যাটাসে আফরোজা সুলতানা নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, গতকাল দুপুরে জিইসি থেকে লালখান বাজার যাওয়ার পথে ১৬-২০ বছর বয়সী কিছু কিশোর তার রিক্সা থামিয়ে প্রকাশ্যে ব্যাগ ছিনতাই করে নিয়ে যায়। আশেপাশে অনেক লোক চিত্রটি হরহামেশা দেখলেও সাহায্যর জন্য কেউ এগিয়ে আসেননি।

রাশেদুর নামে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, গত পরসুদিন চকবাজার হতে কোচিং শেষে গনি বেকারি মোড় দিয়ে বাসায় ফেরার পথে কথিত বড় ভাই! ডাকার কথা বলে ৫-৬ জন কিশোর অন্ধকার গলিতে নিয়ে গিয়ে ছুরি ধরে তার মোবাইল ম্যানিবেগ নিয়ে যাই।

এ ধরনের শতাধিক কিশোর অপরাধ প্রতিনিয়ত ঘটছে বন্দর নগরীর বিভিন্ন অলি গলিতে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কর্তাব্যাক্তিরা বলছেন, কিশোর গ্যাং অপরাধ প্রতিরোধে তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছেন।তবে পারিবারিক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দিচ্ছে বেশি।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, কিশোরদের এভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়া রাষ্ট্রের জন্য বড় একটি সংকট। পারিবারিক এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এর জন্য দায়ী।

অপরাধ বিজ্ঞানীদের অভিমত, সমাজে নানা অসঙ্গতি রয়েছে। নিজেদের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কিশোররা। তাদের আচরণে পরিবর্তন হচ্ছে।যার ফলে তথ্য-প্রযুক্তি ও আড্ডার নেতিবাচক দিকে ধাবিত হচ্ছে। অনেকে তাদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে। এর দায় আমাদের। তাই সামাজিক সচেতনতা আমাদের জন্য খুবই জরুরি।

উল্লেখ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সমাজের সবাইকে সচেতন হতে হবে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে।
সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা করার সুযোগ থাকলে কিশোররা বিপথগামী কম হয়। তবেই কিশোর অপরাধ অনেকটা কমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে ।

Leave a Reply

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

May 2019
S M T W T F S
« Apr   Jun »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  
%d bloggers like this: