চট্টগ্রাম, শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯

কোন সার্টিফিকেট লাগবে টাকা দিন পেয়ে যাবেন

প্রকাশ: ২০১৯-০৫-১৯ ২৩:০৯:২৪ || আপডেট: ২০১৯-০৫-১৯ ২৩:০৯:২৪

স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে কখনো পা না দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে ‘অ্যাকাডেমিক সার্টিফিকেট’। এরজন্য কষ্ট করে দিনরাত পড়াশোনা বা নামিদামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

লাগবে শুধু টাকা আর যোগাযোগ। এরপর নির্দিষ্ট চ্যানেল ধরে জায়গামতো গেলে শোনা যাবে, ‘কোন সার্টিফিকেট লাগবে, টাকা দিন, পেয়ে যাবেন’। জাল সনদের এই গোপন রমরমা বাজার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের রাজধানীর নীলক্ষেতে।

টাকা দিলে ওই বাজারে মিলে মেডিক্যাল, বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জাল সনদ। এছাড়া শিক্ষা বোর্ডের জাল সনদ, নম্বরপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, স্মাটকার্ড, ট্রেড লাইসেন্স, ম্যারেজ সার্টিফিকেট, নাগরিকত্ব সনদও পাওয়া যায় অনায়াসে।

শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও বাড়তি সুবিধার আশায় এখান থেকে নকল শিক্ষাগত সনদ সংগ্রহ করছেন বহু মানুষ। এই ভুয়া সনদ দিয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভালো চাকরিও করছেন অনেকে।

নীলক্ষেতে জাল সার্টিফিকেট তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান বলেন, নকল সার্টিফিকেট তৈরি কিংবা সার্টিফিকেট নিয়ে কোনো ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ আমাদের কাছে নেই। তবে যদি এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমরা পাই তাহলে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নীলক্ষেতের সিটি করপোরেশন মার্কেট, বাকুশাহ মার্কেট ও শাহ সাহেব বাড়ি মরিয়ম বিবি শাহী মসজিদ মার্কেটে মূলত নকল সার্টিফিকেট প্রস্তুত করা হয়। গত রবিবার ও সোমবার সরেজমিনে নীলক্ষেতের তিনটি মার্কেটে সেবাগ্রহীতা সেজে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ছয় দালালের।

বাকুশাহ মার্কেটের ভিশন কম্পিউটার অ্যান্ড প্রিন্টিংয়ের সামনে আসতেই হঠাৎ এক দালাল সামনে এসে বলেন, ভাই, কি লাগবে? ফটোকপি নাকি সার্টিফিকেট? বললাম সার্টিফিকেট। শামীম নামে পরিচয়দানকারী ওই দালাল বাকুশাহ মার্কেটের পেছনে নিয়ে যান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের সার্টিফিকেট তৈরির কথা বললে ওই দালাল তিন হাজার টাকা চান। পাশাপাশি নিজের আত্মীয়ের বিদ্যমান চারটি সার্টিফিকেটের ডামি সার্টিফিকেট করতে চাইলে প্রতিটির জন্য এক হাজার করে চার হাজার টাকায় রফাদফা হয়।

আর নকল সার্টিফিকেট হলে প্রতিটির জন্য দেড় হাজার টাকা দাবি করেন ওই দালাল। এর সঙ্গে নিজের জন্য একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের স্মার্টকার্ডও তৈরি করে দেবেন বলে জানান।
সাত হাজার টাকায় পাঁচটি সার্টিফিকেট ও স্মার্টকার্ড চূড়ান্ত হলে অগ্রিম দেওয়ার প্রস্তাব করেন দালাল। একদিনের মধ্যে সব প্রস্তুত করবেন বলে জানান।

দালালের ফোন নম্বর নিয়ে এই প্রতিবেদক জানান, এখন টাকা নেই। ইফতারের পর অথবা আগামীকাল এসে সব চূড়ান্ত করব। এরপর দালাল মার্কেটের ভিতরে তার সঙ্গে কথা না বলতে অনুরোধ করে চলে যান।

আলমগীর নামের এক দালাল বলেন, বোর্ডের প্রতিটি সার্টিফিকেট দেড় হাজার টাকায়, ডিজিটাল ড্রাইভিং লাইসেন্স ১২শ টাকায়, এনআইডি ৮শ টাকায়, স্মার্ট এনআইডি ১২শ টাকায়, ট্রেড লাইসেন্স ৮শ টাকায়, ম্যারেজ সার্টিফিকেট ৩শ টাকায়, নাগরিকত্ব সনদ ৩শ টাকায়, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ৫শ টাকায় ও মার্কশিট ১ হাজার টাকায় করা যাবে।

এসবের জন্য দোকানদাররা সরাসরি কাস্টমারের সঙ্গে কথা বলেন না। যোগাযোগ স্থাপনের জন্য রয়েছে দালাল চক্র। চক্রগুলো তিন ধাপে কাজ করে থাকে। প্রথম গ্রুপের কাজ হচ্ছে কাস্টমার সংগ্রহ করা।

দ্বিতীয় গ্রুপের কাজ আসল সার্টিফিকেটের ফরমেট ও বিশেষ ধরনের কাগজ সংগ্রহ করা এবং তৃতীয় গ্রুপটির কাজ আসলের মতো কম্পিউটারে সনদ তৈরি করা। সার্টিফিকেট তৈরির জন্য আছে বিশেষ সফটওয়্যার।

ওই সফটওয়্যার ব্যবহার করলে সনদের ওপর কোনো সিল ও স্বাক্ষর থাকলে সেটি নকল না আসল তা বোঝার সুযোগ নেই। বোর্ডে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনদগুলো তৈরিতে অ্যাম্বুস কাগজ ব্যবহার হয়। কাগজের রঙের সঙ্গে মিল রেখে এ সনদ তৈরি করা হয়। একইভাবে তৈরি করা হয় জাল মার্কশিট।

নকল সার্টিফিকেট গ্রহণকারী কারা?
বিশেষ করে স্বল্প শিক্ষিত বিদেশমুখী যুবকরা জাল শিক্ষা সনদের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অনেকেই সনদ হারিয়ে ফেলেছেন এবং সনদের ফটোকপি দিয়ে অনুরোধ করে সনদ বানিয়ে নেন।

আবার বিভিন্ন কোম্পানি বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে যোগদানের শর্ত থাকে সার্টিফিকেট জমা। এক্ষেত্রে নকল সনদ প্রস্তুত করেন এক শ্রেণির চাকরিজীবী। পাত্র বা পাত্রীপক্ষকে শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি দেখানোর জন্যও সার্টিফিকেট বানানো হয়।

তবে এ দেশের শিক্ষাগত যোগ্যতার সব সনদ অনলাইনে না থাকার কারণে এই নকল সার্টিফিকেট তৈরি বন্ধ সম্ভব হচ্ছে না। দেশে ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরি করছেন সরকারি কর্মকর্তা, ডাক্তার, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার লোক। অন্যদিকে জাল পরিচয়পত্র তৈরি করে টিউশনিতে সুযোগ নিচ্ছেন এক শ্রেণির ছাত্র।

ভুয়া সার্টিফিকেট শনাক্তকরণ
গত কয়েক বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শত শত ভুয়া সার্টিফিকেট শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ব্যাংকার, সরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, বিদেশে চাকরিজীবী ও আইনজীবী রয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাল সার্টিফিকেট ব্যবহার করে রাব্বি নামের (ছদ্মনাম) এক শিক্ষার্থী একটি ব্যাংকের এজিএম পদে পর্যন্ত চাকরি করছিলেন। ডিএমপির মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশন বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, নকল ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরির অপরাধে আটজনকে গ্রেফতার করেছি।

জাল সনদ তৈরির সঙ্গে জড়িতদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বাহালুল হক চৌধুরী বলেন, শনাক্ত করে সনদ ভুয়া হলে জানিয়ে দেওয়া হয়। তবে ঢাবির সনদ জাল করা কঠিন বলে জানান তিনি।

Leave a Reply

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

May 2019
S M T W T F S
« Apr   Jun »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  
%d bloggers like this: