চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

চট্টগ্রাম থেকে ভারত যাচ্ছে বছরে ৭০ হাজার রোগী

প্রকাশ: ২০১৯-০২-০৯ ০০:১২:৪০ || আপডেট: ২০১৯-০২-০৯ ০০:১২:৪০

ঢাকার একটি হাসপাতালে পাইলসের অপারেশন করেছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা। কিন্তু পাইলস পুরোপুরি সারেনি। এখন ভারতের চেন্নাইয়ে গিয়ে দ্বিতীয়বার একই অপারেশন করতে হয়েছে তাকে। মাঝখানে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় আর কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে।

শুধু ওই কর্মকর্তা নয়, সাধারণ অনেক মানুষই চিকিৎসার জন্য ছুটছেন ভারতে। প্রতিবছর ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বিদেশি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ভারতের সরকারি হিসাবে দেখা যায়, দেশটিতে চিকিৎসাসেবা নেয়া প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন বাংলাদেশি।

চট্টগ্রামের ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম থেকে এক লাখ ৩৫ হাজার তিনশ মানুষ ভারতীয় ভিসা নিয়েছেন। এরমধ্যে চিকিৎসা ভিসা নিয়েছেন ৫৫ হাজার রোগী। গত বছর (২০১৮ সাল) চট্টগ্রাম থেকে ভারতীয় ভিসা নিয়েছেন এক লাখ ৯০ হাজার মানুষ। এরমধ্যে চিকিৎসা ভিসা নিয়েছেন ৭০ হাজারেরও বেশি রোগী।

এক বছরের ব্যবধানে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ১৫ হাজার।
চট্টগ্রামে অবস্থিত ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার কার্যালয়ের সেকেন্ড সেক্রেটারি সুভাশীষ সিনহা বলেন, ভারতীয় ভিসা প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। নথিপত্র ঠিক থাকলে কোনো ঝামেলা ছাড়াই ভিসা পাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। তবে চিকিৎসা সংক্রান্ত ভিসার ক্ষেত্রে বিশেষ নজর রয়েছে। চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র থাকলে দ্রুত সময়ের মধ্যে ভিসা দেওয়া হচ্ছে।
তাঁর আড়াই বছরের দায়িত্ব পালনকালে তিনি বাংলাদেশিদের ভারতীয় ভিসা আবেদন সহজতর করতে সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও নোয়াখালীতে চারটি আবেদনকেন্দ্র খোলা হয়েছে বলে জানান তিনি। চট্টগ্রাম বিভাগের অধীনে এসব কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত আবেদন নেওয়া হচ্ছে এবং ভিসাও প্রদান করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ভারতের পাশ্ববর্তী ও বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র। আমরা বাংলাদেশ ভালবাসি। সেজন্য বাংলাদেশ থেকে পর্যটক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত ভিসা পেতে যাতে কোনো ধরনের হয়রানি বা দালালের খপ্পরে পড়তে না হয়, সেজন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে গত ১০ দিন ভারতের বেঙ্গালুরুতে অবস্থানকালে দেখা যায়, রোগীদের অধিকাংশই বাংলাদেশের নাগরিক। শুধু উচ্চবিত্ত নয়, মধ্য ও নি¤œবিত্ত মানুষও কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে ভারতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে আবার ক্যান্সার, কিডনী, হার্ট অপারেশনসহ জটিল রোগী যেমন রয়েছে, আবার সামান্য রোগের কারণেও অনেকেই ভারতে ছুটে যাচ্ছেন।

কথা হয়, চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকার কামাল উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি মা, স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, আড়াই বছর আগে হার্টের বাইপাস সার্জারি করেছেন তিনি। এখন চেক আপ করাতে এসেছেন। মায়ের কিডনী পরীক্ষাও করাবেন।

রাঙ্গামাটি থেকে স্ত্রী, ছেলে-সন্তানসহ ১৪ জনের বহর নিয়ে ভারতের বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা নিতে গেছেন রশিদ আহমদ ও ফারুক আহমদ। রশিদ আহমদ বলেন, নিজের ছেলে ও বড় ভাইয়ের মেয়ের চিকিৎসা নিতে এসেছেন।

তিনি বলেন, ভারতের ভেলোর ও বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা নিতে কোনো ধরণের হয়রানি বা দালালের খপ্পরে পড়তে হয় না। ঝামেলামুক্ত পরিবেশে চিকিৎসা নেওয়ার সুবিধা রয়েছে।

বেঙ্গালুরুতে বিখ্যাত নারায়না ইনস্টিটিউট অব কার্ডিয়াক সাইন্সেস হাসপাতালে (ডা. দেবী শেঠীর হাসপাতাল নামে অধিক পরিচিতি) দেখা যায়, রোগীদের মধ্যে বেশির ভাগই বাংলাদেশের নাগরিক। বাংলাদেশি রোগীদের রেজিস্ট্রেশন বা চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য আলাদা বুথ রাখা হয়েছে। এখানে ভিসা থেকে শুরু করে চিকিৎসা সংক্রান্ত সব বিষয়ে বাংলা ভাষায় পরিসেবা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালের চিকিৎসক থেকে শুরু করে নার্স-আয়াদের সবাই হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় কথা বলেন। আবার নিজেদের মধ্যে বেঙ্গালুরুর আঞ্চলিক ভাষা কর্ণাটকি ভাষায় কথা বলেন। তবে বাংলা ভাষাভাষিদের ভাষা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের জন্য বাংলায় পরিসেবা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী ও স্বজন মিলে অনেকের সঙ্গে কথা হয়।

তাদের মতে, বিশ্বাস, ব্যবহার, আচরণ আর রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে অনেকটা সন্তুষ্ট। এসব কারণে বাংলাদেশি রোগীদের টেনে নিচ্ছে ভারত। বিশেষ করে ডায়াগনস্টিক বিষয়ের প্রতি আস্থা বেশি রয়েছে। অনেকের অভিমত, চিকিৎসার নামে হয়রানির শিকার হতে হয়নি। একটি ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা একাধিকবার করানো হয় না। চিকিৎসকরা রোগীকে যথেষ্ট সময় দেন। রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে রোগের বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন। চিকিৎসা সংক্রান্ত খরচ বাংলাদেশের তুলনায় অনেকটা কম। এছাড়াও হাসপাতালগুলোতে ভর্তিকৃত রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসক ও নার্সদের মার্জিত ব্যবহারে রোগীরা স্বাচ্ছন্দবোধ করেন।

চট্টগ্রামে অবস্থিত হাইকমিশনারের ব্যক্তিগত সহকারী বিপুল বড়–য়া জানান, ভারতীয় ভিসা পেতে এখন আর কোনো ঝামেলা নেই। সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র হওয়ায় বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা দেওয়ার বিষয়ে খুবই আন্তরিক ভারত সরকার।
স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিরেক্টরেট জেনারেল অব কমার্শিয়াল ইন্টেলিজেন্স এন্ড স্ট্যাটিস্টিকস (ডিজিসিআইএন্ডএস) একটি সমীক্ষা চালিয়েছে।

সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ভারতে চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারী বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে বেশি ছিল বাংলাদেশি।

দেখা যায়, ২০১৭ সালে মেডিকেল ভিসা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে এক লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি নাগরিক ভিসা নিয়েছেন। ২০১৬ সালে ভারতগামী চিকিৎসা ভিসার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে আসা চার লাখ ৬০ হাজার রোগীর মধ্যে এক লাখ ৬৫ হাজার রোগীই হচ্ছেন বাংলাদেশি।

Leave a Reply

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

February 2019
S M T W T F S
« Jan    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
2425262728  
%d bloggers like this: