চট্টগ্রাম, , শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮

চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়

প্রকাশ: ২০১৮-০৭-০৪ ১৫:৫৪:১৭ || আপডেট: ২০১৮-০৭-০৪ ১৫:৫৪:১৭

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতাল সম্প্রতি চিকিৎসাধীন এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় আলোচনায় এলেও, প্রতিষ্ঠানটির সেবা নিয়ে অনেক আগে থেকেই নানা অভিযোগ রয়েছে।
২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বেসরকারি হাসপাতালের অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়, অবহেলা, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, ভুল চিকিৎসা সর্বোপরি স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে একাধিক সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করেছেন।
হাসপাতালটির বিরুদ্ধে একাধিকবার শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মেহেদীবাগে প্রতিষ্ঠিত ম্যাক্স হাসপাতালের বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে।

এর আগে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মজুদ রাখায় ২০১৬ সালের ২৬ জুন হাসপাতালটিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেন র্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরওয়ার আলম। এছাড়া রোগীর কাছে বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ দামে ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী বিক্রির দায়ে ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই সেকান্দর নামের এক ভুক্তভোগী (রোগীর নিকটাত্মীয়) ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করলে চলতি বছরের ৬ মার্চ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এ বিষয়ে সেকান্দর বলেন, ম্যাক্স হাসপাতালের সেবার মান নেই বললেই চলে। নাম করা ডাক্তাররা এ হাসপাতালে চেম্বার করার কারণে আমার স্ত্রীকে ভর্তি করাই। কিন্তু ওষুধ ও সরবরাহ করা বিভিন্ন পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেশি রাখায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ দেয়া হলে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছরের ৪ জুন আইনজীবী আব্দুল আওয়াল তার আট মাস বয়সী সন্তানকে জ্বরের কারণে ম্যাক্স হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ডা. বিধান রায় চৌধুরীকে দেখালে তিনি জ্বরের পাশাপাশি কফের ওষুধ দেন। ওষুধ খাওয়ানোর পর শিশুটির বমি শুরু হলে ডাক্তার বমির ওষুধ দেন। ওই ওষুধ খাওয়ালে শুরু হয় পাতলা পায়খানা। হাসপাতালে গিয়ে ডা. বিধান রায়ের সঙ্গে সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ভর্তি করাতে বলেন। গত ৬ জুন ভর্তির পর কর্তব্যরত চিকিৎসক ১০০০ মিলি স্যালাইন দেন। স্যালাইন শেষ হলে শিশুর শরীর ফুলে যায়। দায়িত্বরত চিকিৎসক ফোনে বিধান রায়ের সঙ্গে কথা বললে তিনি একদিন পর ৫০০ মিলির স্যালাইন দেয়ার নির্দেশ দেন। আব্দুল আওয়ালের এক মামা (তিনিও চিকিৎসক) হাসপাতালে এসে শিশুর শরীর ফুলে যাওয়া দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। শিশুকে ভুল মাত্রার স্যালাইন দেয়ার বিষয় বিধান রায়কে জানালে দ্রুত স্যালাইন বন্ধ করেন দায়িত্বরত চিকিৎসকরা। পরে শিশুটিকে অন্য হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর সুস্থ হয়।

আরেকটি ঘটনায় জানা গেছে, গত ৩০ এপ্রিল ম্যাক্স হাসপাতালে জ্বর নিয়ে ভর্তি হয় হালিশহর সিলভার বেলস স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী নবনী সরকার মৌনতা (১৪)। চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে জরুরি বিভাগে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক বলেন, ম্যালেরিয়া হয়েছে। এরপর তাকে স্যালাইন ও ইনজেকশন পুশ করা হয়। স্যালাইন দেয়া অবস্থায় তার এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা হয়। একপর্যায়ে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। তখন চিকিৎসক বলেন, তার অক্সিজেন লাগবে, কিন্তু কেবিনে মাস্কযুক্ত অক্সিজেন না থাকায় আইসিইউতে নিতে বলেন।

এ চিকিৎসকও সেলফোনেই সব পরামর্শ দিয়ে গেছেন। সেদিন রাত ১০টায় তিনি এসে বলেন, ৪০ ব্যাগ রক্ত লাগবে। পরদিন হাসপাতালে বোর্ড মিটিং বসে। এরপর তাকে এক ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়। কিন্তু তাতে কোনো উন্নতি না হওয়ায় ঢাকায় এ্যাপোলো হসপিটালে নেয়া হয়।

সেখানে চিকিৎসকরা বলেন, মৌনতার ব্লাড সেল নষ্ট হয়ে গেছে। শরীরে পানি জমে ফুসফুস অনেক ফুলে গেছে। গত ৭ মে মৌনতা মারা যায়। গত সোমবার মৌনতার আত্মীয় জয়শ্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে এসব তথ্য জানান।

আরো জানা গেছে, চলতি বছরের ২৩ মার্চ সাত বছর বয়সী ফারদিন পেটব্যথা নিয়ে ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি হয়। কিন্তু কর্তব্যরত চিকিৎসকরা আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে এপেন্ডিসাইটিস হয়েছে বলে জানান। সেদিন রাতেই নগরীর অপর একটি হাসপাতালে ভর্তি করালে পরীক্ষা করে বলা হয়, খাদ্যের বিষক্রিয়া। সেখানে চিকিৎসায় সে দ্রুত সেরেও ওঠে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ম্যাক্স হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. লিয়াকত আলী বলেন, যেকোনো হাসপাতালের রোগীর মৃত্যু কাম্য নয়। এর পরও জগতের নিয়মানুসারে মৃত্যু হতেই পারে। আমরা রোগীদের সেবার মান সর্বোচ্চ রাখতে সচেষ্ট। কোনো ধরনের অভিযোগ এলে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখে ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুলভ্রান্তি যাতে না হয়, সে বিষয়ে সংশোধনের চেষ্টা করি।

হাসপাতালের লাইসেন্স না থাকা ও অনুমোদন না থাকার অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমাদের কাছে সরকারি সব বৈধ অনুমোদন রয়েছে। সম্প্রতি ভুল চিকিৎসায় সাংবাদিকের সন্তান মৃত্যুর বিষয়টি খতিয়ে দেখে সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

Leave a Reply

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

July 2018
S M T W T F S
« Jun    
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
%d bloggers like this: