চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ১৯ জুন ২০১৮

ফেসবুক-ইনষ্টাগ্রামের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে ঈদ কার্ডে শুভেচ্ছা বিনিময়!

প্রকাশ: ২০১৮-০৬-১৩ ০১:৩২:১৮ || আপডেট: ২০১৮-০৬-১৩ ০১:৩২:১৮

উৎসব এলেই জীবন জুড়ে খেলা করে নানা রঙ আর সেই রঙে মিশে থাকে আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা সবকিছু।

একটা সময় ছিলো, যখন ঈদ এলেই…রঙিন কার্ডে শুভেচ্ছা জানাবার হিড়িক পড়ে যেতো। যদিও সমসাময়িক সময়ে খুঁজে পাওয়া ভার, সেই ঐতিহ্য। প্রযুক্তি যেনো কেড়ে নিয়েছে পুরোনো সেই আবেগ। একটা সময় ছিল যখন অনুভুতির নানা-কথা এভাবেই হরেক রঙে ডানা মেলতো কাগুজে শুভেচ্ছায়। পাড়া-মহল্লার অলিতে কিংবা গলিতে…ভীড় জমতো নানা বয়সের ধুম পড়ে যেতো কার্ডের ছোট ছোট দোকানে…যদিও বর্ণিল সেই দিনগুলি এখন অনেকটাই অতীত।

সময়ের পরিক্রমায়, প্রযুক্তির সাথে সাথে অনুভুতিগুলোও আজ মেলেছে ডানা। প্রিয়জনের জন্য খুজে ফিরে পছন্দের কার্ডটি বেছে নেওয়ার গল্পটা তাই হারিয়েছে বেগ, আবেগ এখন ফেসবুক, ইনষ্টাগ্রামের অলিতে-গলিতে।

একসময় রমজানের শুরুতেই পাড়া-মহল্লার দোকানগুলো রঙিন হয়ে উঠত ঈদ কার্ড, ভিউকার্ডে। নানা রঙে বর্ণিল সুদৃশ্য কার্ডের ওপর লেখা থাকত ‘ঈদ মোবারক’। শুধু দোকানগুলোতেই নয়, পাড়ার ছেলেরা শামিয়ানা টাঙিয়ে তার নিচে টেবিল সাজিয়ে বসত ঈদকার্ড বিক্রির জন্য। আর সেসব কার্ড মোড়ানো থাকত স্বচ্ছ পলিথিনে। বেশ কয়েকটা চেয়ার পাতা থাকত সেখানে আর আড্ডা জমত পাড়ার ছেলেদের। ঈদের বেশ আগেই আনন্দ লেগে থাকত সবার চোখেমুখে। গুঞ্জন উঠত কে কাকে ঈদ কার্ড দিল, কে কাকে দেবে, আর এরপরই প্রিয়জনের কাছ থেকে শুভেচ্ছা পাওয়ার জন্য চলত অপেক্ষার পালা। আজ হয়ত তরুণ-তরুণীরা জানেও না এসব কার্ডের কথা। তাদের কাছে এসব গল্পের মতো। এখন ঈদ কার্ডের স্থান দখল করেছে ই-কার্ড, এসএমএস বা ফেসবুকে শুভেচ্ছা বিনিময়।

ঈদ উপলক্ষে ঈদকার্ডের আদান-প্রদান ছিল আমাদের সংস্কৃতির অংশ। বাহারি রং আর মিষ্টিমধুর কথায় ভরা থাকত কার্ডের ভেতরটা। কিন্তু সময়ের আবর্তে সেই সংস্কৃতি এখন নেই বললেই চলে। শুধু তাই নয়, এখন আর অনেকে কষ্ট করে খুদে বার্তাও পাঠায় না। ভালো একটা কার্ডের ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে সেটাই পরিচিতজনদের ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করে বা ম্যাসেজ আকারে পাঠিয়ে দিয়ে চলে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়। এর পাশাপাশি আরো আছে টুইটার, হোয়্যাটসঅ্যাপ, ভাইবার। ঈদ শুভেচ্ছা এখন ডিজিটাল! তবে ঈদ কার্ডের প্রচলন এখন শুধু রয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে। প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতাকে বা বিরোধীদলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানাতে শোনা যায়। এছাড়া বড় কিছু প্রতিষ্ঠান বা করপোরেট হাউসগুলো নিজেরা কার্ড ছাপিয়ে ঈদ শুভেচ্ছাবার্তা পাঠায় চেনা-অচেনা লোক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের।

ঈদ কার্ডের জন্য বিখ্যাত রাজধানীর পল্টন এলাকার আজাদ প্রোডাক্টস, আইডিয়াল প্রোডাক্টস, নিউ মার্কেটের আর্চিস বা হলমার্কের দোকানগুলোতেও ঈদ কার্ডের ক্রেতা মেলা ভার। সরেজমিন এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে গিয়ে ঈদ কার্ড বিক্রির মন্দাদশা পরিলক্ষিত হয়েছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে এই কার্ড দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় এখনো কিছুটা প্রচলিত আছে শিশু এবং স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের মধ্যে। তাও খুব একটা নয়। তবে তরুণ-তরুণীরা এখন ঈদ কার্ড দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করে না বললেই চলে।

এ প্রসঙ্গে আজাদ প্রোডাক্টস-এর পরিচালক জিয়াউর রহমান আজাদ বলেন, ‘ঈদ কার্ড বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ের যে সংস্কৃতি ছিল সেটা এখন আর নেই। আমরা এখন ঈদ কার্ড বানাই শুধু প্রতিষ্ঠানের জন্য। একসময় ঈদ কার্ড বিক্রির ধুম ছিল, ব্যবসা হতো ভালো, সেটার এখন কিছুই নেই। এখন ব্যবসা মূলত বিয়ের কার্ড বিক্রির ওপরই নির্ভরশীল।’
আইডিয়াল প্রোডাক্টস-এর ম্যানেজার নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘দশ বছর আগেও এমন অবস্থা ছিল যে ঈদের এই সময়টাতে দম ফেলার সময় থাকত না। সারাদেশ থেকে পাইকারি ও খুচরা ক্রেতাদের আগমনে আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরব থাকত।

হয়তোবা তাই আর্চিজ, হলমার্কসহ অনন্য গিফট শপগুলোতে…ভীড়-ভাট্টা চোখে পড়েনা তেমন। আর চাহিদার মাপকাঠিতে, কার্ডের সংখ্যাটাও কম বলে জানালেন এই বিক্রেতা। একটা সময় ঐতিহ্যের এমন অনুষজ্ঞে মিশে থাকতো নিখাঁদ ভালোবাসা। সেই জোয়ারে হয়তো ভাটা পড়েছে সাময়িক। তবে, প্রজন্মের রঙিন পাখায় ভর করে আবারো ডানা মেলবে কাগুজে শুভেচ্ছা- এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

Leave a Reply

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

June 2018
S M T W T F S
« May    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
%d bloggers like this: