চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮

সিনেমার ‘দুর্দিন’, ‘এক্সট্রা আর্টিস্ট’রা দেহ ব্যবসায়

প্রকাশ: ২০১৮-০৫-২৫ ০১:২০:১৫ || আপডেট: ২০১৮-০৫-২৫ ০১:২০:১৫

ঢাকাই সিনেমার বাণিজ্যিক অবস্থা যখন ভালো ছিল, এক্সট্রা (অতিরিক্ত) কিংবা জুনিয়র (কনিষ্ঠ) আর্টিস্টদের (শিল্পী) কদর ছিল বেশ। সময়ের পালাবদলে পরিস্থিতি অনেক পাল্টে গেছে। কঠিন বাস্তবতায় সেই এক্সর্টা আর্টিস্টদের অনেকেই এখন বহু কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। জীবনের প্রয়োজনে তাদের কেউ কেউ জড়িয়ে পড়েছেন দেহ ব্যবসায়।

প্রিয়.কমের অনুসন্ধানে এমনটা বেরিয়ে এসেছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এক মাস সময় নিয়ে কথা বলা হয় চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। এ ছাড়া তিনজন এক্সট্রা আর্টিস্টও অর্থাভাবে তাদের জীবনের বেদনাদায়ক মোড় নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংবাদমাধ্যমটির কাছে।

দেহ ব্যবসায় জড়ানোর অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে শুরুতে বেশ কয়েকজন এক্সট্রা আর্টিস্টের সঙ্গে কথা বলা হয়। তবে তাদের কয়েকজন বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। কেউ আবার টাকার বিনিময়ে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলেও পরে অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে গিয়েছেন।

উপায় না দেখে এই প্রতিবেদক নিজেই একদিন সন্ধ্যার আগে খদ্দের সেজে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) যান। এক্সট্রা আর্টিস্টদের একজনের সঙ্গে তিনি কিছুটা সময় আলাপ করেন। একটা সময় গিয়ে তিনি এ প্রতিবেদকের সঙ্গে টাকার বিনিমেয়ে যেকোনো স্থানে গিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ সময় কাটাতে প্রস্তুত বলে জানিয়ে দেন। পরে তার কাছ থেকে এ রকম আরও দুজনের সন্ধান পাওয়া যায়।

ওই একস্ট্রা আর্টিস্ট জানান, তার দেখানো পথেই যেন অনুসরণ করা হয়। ছলচাতুরীর আশ্রয় নিলে ভালো হবে না।

এক্সট্রা শিল্পী বা জুনিয়র আর্টিস্টদের ‘জুনিয়র আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটি সংগঠন থাকলেও এর কোনো কার্যকারিতা নেই। প্রায় ৩৫০ জন সদস্যকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ নামমাত্র এই সংগঠনটি। সামান্য আয়ের টাকার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ তুলে দিতে হয় দালাল ও চাঁদাবাজদের হাতে। অভিনয় করতে গিয়ে আহত হলে চিকিৎসা পান না তারা। এক সময় তাদের বেশ কদর ছিল। কিন্তু এখন আর সেই অবস্থা নেই।

চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য

এফডিসিকে ব্যবহার করে দেহ ব্যবসার বিষয়ে প্রায় ১৫০টি সিনেমাতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করা আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্যই এক্সট্রা আর্টিস্টরা একটা সময় গিয়ে এই পেশায় জড়িয়ে পড়েন। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে সিনেমায় অভিনয় না করা লোকজনও। তারা জানে, এফডিসিতে এলে টাকা আয়ের পথ খুঁজে পাওয়া যায়। তারা সবাই-সবাইকে চিনেও। এফডিসিতে বহুদিনের যাতায়াত তাদের। তাই এ নিয়ে কেউ কথা বলেন না।

মামুন জানান, দালালদের সম্পর্কেও এক্সট্রা আর্টিস্টদের ভালো ধারণা আছে। দালাল হিসেবে সিনেমার সঙ্গে জড়িতরাই কাজ করে থাকেন। কিন্তু তাদের এফডিসিতে দিনের অন্যান্য সময় পাওয়া যায় না। বেশির ভাগ সময় বিকেলে এসে এশার নামাজের সময় চলে যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দেহ ব্যবসায় জড়িত এক্সট্রা আর্টিস্টের সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ জন। এফডিসিকে একটি পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করেন এক্সট্রা আর্টিস্টরা। খদ্দেরদের কাছে তারা নিজেদের সিনেমার নায়িকা হিসেবে দাবি করেন। তাতে কিছু টাকা বেশি পাওয়া যায়।

কী পয়েন্ট ইনস্টলেশন তথা কেপিআইভুক্ত এলাকা হওয়ার পরও দালালদের সহযোগিতায় ওই এক্সট্রা আর্টিস্টরা এফডিসিতে প্রবেশ করে। তাদের সিন্ডিকেট বেশ শক্তিশালী। এ ছাড়া হঠাৎ করে তাদের দেখে বোঝার কোনো সুযোগ নেই।

এফডিসি প্রশাসন কঠোর হলে এমনটা ঘটত না বলে মনে করেন মামুন। তিনি বলেন, ‘সবকিছু যেহেতু ফোনের মাধ্যমে ডিল করা হয়, তাই তাদের অনেক কিছুই বোঝা মুশকিল। আর এফডিসির প্রশাসনের লোকজন যতক্ষণ থাকেন, ততক্ষণ তারা এফডিসিতে প্রবেশ করে না। তাই হয়তো বিষয়টি তাদের নজরে আসে না। তবে অনেকেই বিষয়টা জানে।’

সম্প্রতি বিষয়টি জানিয়ে অভিযোগ আকারে এফডিসি প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি। কিন্তু এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির হোসেন। তার ভাষ্য, কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তিনি ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।

শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আপনি যাদের কথা বলছেন, আমি তাদের কোনো সিনেমাতে অভিনয় করতে দেখি নাই। এখন কেউ যদি শিল্পী দাবি করে এ ধরনের কাজ করে, তার দায় তো আর শিল্পী সমিতি নিবে না। এটার সঙ্গে এফডিসির নিরাপত্তারক্ষীরা জড়িত। তা না হলে তারা তো ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। এর জন্য তো এফডিসির দুর্নামও হয়। আর শিল্পী সমিতির সদস্য যারা, তাদের প্রত্যেকেরই কার্ড রয়েছে।

এরা (একস্ট্রা আর্টিস্ট) এফডিসির নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বিকালটা ঘুরে বেড়ায়। তারপর তাদের উদ্দেশ্য অনুযায়ী, যে যার জায়গায় চলে যায়। তবে যারা প্রকৃত শিল্পী, তারা না খেয়ে থাকলেও এ ধরনের কাজ করবে না। আমাদের কমিটি আসার পরে আমরা বিকাল পাঁচটার পরে যদি কারো কাজ না থাকে, তাহলে সে এফডিসিতে থাকতে পারবে না। তারপরও বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ঘটনা ঘটছেই। এফডিসির কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে আরও সজাগ হওয়া দরকার। গেটে টাকা দিলেই যেকোনো লোক এফডিসিতে প্রবেশ করতে পারে। এটার জন্য শিল্পীরাও মাঝেমধ্যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে। এতে এফডিসির ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।’

যারা এক্সট্রা নামে পরিচিত তারা আগে এফডিসিতে এলে এক শিফটে ২০০ টাকা পেতেন। এখন তাদের নির্দিষ্ট আয়ের কোনো পথ নেই। এ ছাড়া এখন যেসব সিনেমা নির্মিত হচ্ছে, তাদের সেখানে খুব একটা ডাক পড়ে না। এ কারণে একটা সময় গিয়ে জীবিকা কিংবা অন্য কিছু কারণে তারা নিজেদের দেহ ব্যবসায় নিয়োজিত করেছেন বলে মনে করেন জ্যেষ্ঠ অভিনেতা ও চলচ্চিত্র পরিবারের আহ্বাবায়ক নায়ক ফারুক।

কিংবদন্তি এই চিত্রনায়ক বলেন, ‘আমার কথা হলো, বাঁচতে চাইলে বহুভাবেই বাঁচা যায়। কিন্তু এভাবে কেন বাঁচতে হবে? এফডিসির প্রধান ফটকে যারা নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন, তারা তো সব জানেন। তারা কেন তাদের তারপরও ভেতরে প্রবেশ করতে দেন? আমার ধারণা, বেশির ভাগ এফডিসির বাইরের লোক। তবে এফডিসির প্রশাসনের বিষয়টি সিরিয়াসলি দেখা উচিত। আর এর পুরোপুরি দায় তাদেরই। সমাজে এ ধরনের চরিত্র তৈরির পেছনে বহু কারণও রয়েছে।’

এফডিসির ভেতরকার একটি ভবন। ছবি: প্রিয়.কম

এফডিসিতে বিষয়টি অনেকটা ওপেন-সিক্রেট হলেও এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির হোসেন। তিনি বিষয়টি এ প্রতিবেদকের কাছেই শুনলেন বলে জানান। তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করলে এফডিসির সুনাম যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

‘আমাদের এখানে নিরাপত্তাব্যবস্থাও বেশ স্ট্রং। তারপরও যদি এমন দুঃখজনক ঘটনা ঘটে, আমি কোনো ধরনের ছাড় দিব না। আমি ব্যবস্থা গ্রহণ করব। শিল্পী সমিতি থেকে এফডিসি প্রশাসনের যে চিঠি দেওয়ার কথা বললেন, তেমন কিছু আমার মনে পড়ছে না। আসলে কার মনোবৃত্তি কী থাকবে, সেটা তো আর বাইরে থেকে বোঝা যায় না। তবে পয়েন্ট হিসেবে তারা যে এফডিসিকে ব্যবহার করছে, সেটা তো ভালো কোনো বিষয় হতে পারে না’, বলেন আমির।

এফডিসির নিরাপত্তা কর্মকর্তা আমিনুল করিম শাহিন। তার কাছেও এ ধরনের কোনো তথ্য নেই দাবি করে বলেন, ‘এফডিসিকে যদি কেউ এ ধরনের কাজের স্থান হিসেবে ব্যবহার করে, সেটা দুঃখজনক বিষয়। যদি সত্যিই এ ধরনের ঘটনা ঘটে, তবে যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কারণ এর জন্য তো ইন্ডাস্ট্রির ভাবমূর্তিও নষ্ট হয়। আমরা কেউই চাই না, এফডিসিকে কেন্দ্র করে এমন কিছু ঘটুক।’

আব্দুল আলিম পিন্টু এফডিসির নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রায় এক দশক। তিনি জানান, এফডিসিতে ১১ জন নিরাপত্তকর্মী রয়েছেন। আর ইনচার্জ রয়েছেন তিনজন। এ ছাড়া নিরাপত্তা কর্মকতা একজন, নিরাপত্তা পরিদর্শক একজন ও সিকিউরিটি সুপারভাইজারও একজন। তারা তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করেন। আনসার দুজন, একজন পুলিশ, আরেকজন হচ্ছে পুলিশের নায়েক। এরা পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করেন।

পিন্টুর কাছে প্রশ্ন ছিল, তাদের কেউ কি টাকার বিনিময়ে এফডিসিতে কাউকে প্রবেশের সুযোগ করে দেন কি না। তিনি বলেন, ‘আমার সামনে এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি। আর যদি কেউ করে থাকে, সেটা গোপনে করে থাকে। এ ছাড়া যদি কেউ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে, বাইরে থেকে দেখে বোঝা মুশকিল। গেট দিয়ে প্রবেশের সময় বাইরের কাউকে আমি যদি কাউকে আটকে দিই, আরেকজন ছেড়ে দেয়, এভাবেই চলছে। উপর থেকে শক্ত নির্দেশনা আসলে এমন হতো না।’

সিনেমার দুর্দিন, ‘এক্সট্রা আর্টিস্ট’দের দেহ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে পিন্টু প্রথমে এড়িয়ে যান। তবে তাদের এফডিসিতে প্রবেশের প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি বলেন, ‘তাদের কয়েকজনকে আমি মাঝেমধ্যেই দেখি ফোনে কথা বলতে বলতে মোটামুটি দামি গাড়িতে উঠে হয় মগবাজার, না হয় কারওয়ান বাজারের দিকে চলে যেতে। একেকদিন একেক রকমের গাড়িতে দেখি। যেটা হয়তো তাদের সঙ্গে যায় না। আমার ধারণা, সরাসরি এফডিসিতে এ বিষয়ে কোনো কিছুর আলোচনা হয় না। তাই এ বিষয়ে এর বেশি বলা মুশকিল।’

পরিচালক সমিতি থেকে এক্সট্রা আর্টিস্টদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এফডিসিতে প্রবেশের জন্য ফটকে জানানো হয়েছে। তবে তাদের দেহ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে কিছু জানেন না বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার।

‘আমরা তাদের এফডিসির এক্সট্রা কিংবা ছোট ছোট চরিত্রের আর্টিস্ট হিসেবেই জানি। তারা কাজের প্রয়োজনে এখানে আসে। যদি কেউ তাদের কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তাহলে আমি আমাদের সমিতির পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করব’, বলেন গুলজার।

রঙিন স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেছে তাদের

প্রতিবেদনের শুরুতেই তিনজন এক্সট্রা আর্টিস্টের কথা বলা হয়েছিল। তাদের তিনজনই দেহ ব্যবসায় সম্পৃক্ত। তাদের একজন সুমনা আক্তার (ছদ্মনাম)।

পরিবারের সঙ্গে রাগ করে সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় আসেন সুমনা। তখন তার বয়স ছিল ২২ কিংবা ২৩ বছর। অবস্থান শুরু করেন রাজধানীর খিলগাঁওয়ে এক আত্মীয়ের বাসায়। কিছু একটা করতে হবে জীবনধারণের জন্য। এ চিন্তা তখন সুমনার মনের মধ্যে ভর করে আছে। আর এই অসহায়ত্বের সুযোগটিই নিয়েছে তার এক প্রতিবেশী, যে কি না সে সময় এফডিসিতে সিনেমা নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

কথা প্রসঙ্গে সুমনা বলেন, ‘আমাকে প্রথমে বলা হলো সিনেমাতে ছোট চরিত্রে অভিনয় করলে ভালো টাকাই পাওয়া যাবে। মাসে ১০-১২ দিন শুটিং থাকলে সে টাকা দিয়ে বাকি মাস চলে যাবে। এভাবেই চলছিল। কয়েক মাস পার হওয়ার পরই সে হঠাৎ করেই একদিন আমাকে বলল, আমি নায়িকা হতে চাই কি না। আমি তার প্রশ্নের কিছুই বুঝলাম না। বলল, তুমি সময় নাও, ভেবে দেখো। আমি কিছুদিন ভাবনার পরে জানালাম, নায়িকা হতে চাই। তখনই সে আমাকে প্রস্তাব দিয়ে বসে, তার আগে আমাকে তার সঙ্গে বিছানায় যেতে হবে। আমি নায়িকা হওয়ার স্বপ্নের মোহে যা করার তাই করে ফেললাম।’

সুমনা জানান, শারীরিক সম্পর্কের পর থেকেই ওই ব্যক্তিটির নম্বর বন্ধ পেতে থাকেন। কোনোভাবেই তার আর খোঁজ পান না তিনি। একটা সময় জানতে পারেন, তিনি (ওই ব্যক্তি) সিনেমার কাজ ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়ে গিয়েছেন। নায়িকা বানানোর প্রতিশ্রুতি সেখানেই যে ধরাশায়ী, সেটাও বুঝতে পারলেন সুমনা। ততদিনে তিনি জড়িয়ে গেছেন, সেই দালাল চক্রটির দলে। এরই মধ্যে সিনেমার অবস্থাও খারাপ হয়ে গেছে। আগের মতো কাজ পান না তিনি। এমন বাস্তবতায় নিশ্চিত আয়ের পথটিই বেছে নেন তিনি।

সুমনা আরও জানান, যারা দেখতে মোটামুটি ‘সুন্দর’, তারাই দালালদের মূল টার্গেট। সিনেমার খারাপ অবস্থা দালালদের এ সুযোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

‘আমি জানতাম, আমার কপালে কী আছে। যে আমাকে নায়িকা বানানোর কথা দিয়েছিলেন, সে একজন প্রতারক। সবাই জানে যে, সে লোকজনকে দেহ ব্যবসার কাজে সহায়তা করে। আমার কোনো উপায় ছিল না। কারণ এখানে আমি তখন কাউকে খুব একটা চিনতাম না। আর এখন আমার পরিবারের কারো সঙ্গেই যোগাযোগ নেই। তাই এফডিসিই আমার বাড়িঘর। এখান থেকে চলে গেলে না খেয়ে থাকতে হবে’, বলেন সুমনা।

এফডিসিতে দেহ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়া আরেক নারী সালমা খাতুন (ছদ্মনাম)। তার স্বপ্ন ছিল নায়িকা হওয়ার। তার পছন্দের নায়িকা কারিনা কাপুর। আর নিজের আয়নায় নিজেকে তিনি সেভাবেই দেখতেন। আর সে লক্ষ্য নিয়েই এফডিসিতে আসেন। ঘোরাঘুরি করেন, রঙিন স্বপ্ন মনে পুষে রেখে।

সালমা জানতেন না, চলচ্চিত্রের রঙিন দুনিয়াটা বাইরে থেকে যতটা উজ্জ্বল, ভেতরে ঠিক ততটা ফ্যাকাশে। এক সময় এক্সট্রা আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করলেও সিনেমা নির্মাণ কমে যাওয়ায় তারও কাজ কমে যায়। নায়িকা হওয়া আর হয়ে ওঠে না। স্বপ্নের মৃত্যু সেখানেই। শুরুতে দিন চলতে তার বেশ কষ্ট হতো।

অনেকটা ধার-দেনা করেই মাস পার হতো। কিন্তু এভাবে আর কত দিন? কিছু তো একটা করতে হবে। কী করা যায়, এটা ভাবতে ভাবতে কিছুদিন চলে যায়। এরপর তার এক পরিচিত সহকর্মী বলল, দেহ ব্যবসায় জড়ানোর কথা। এখান থেকে লোভনীয় আয় হবে, সেটাও জানিয়ে দেন।

সালমার ভাষ্য, ‘আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি, যার কারণে এ পথে এসেছি। যখন পুরোপুরি জড়িয়ে গেলাম, দেখলাম এটা দুনিয়ার মধ্যে আরেক দুনিয়া। এখানে কোনো মানুষ নেই, সব পশু। নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন তো বহু আগেই ভেঙে গেছে। কিন্তু সেই সাথে সাথে আমার মধ্যে থেকে মানবিকতাও চলে গেছে।’

একেকজনের জীবনের রং বদলের খেলা একেক রকম হলেও পরিণতি দিন শেষে একই হয়েছে। সেই কঠিন জীবন ও সময়ের মুখোমুখি হয়েই এ পথে আসতে হয়েছে বলে দাবি তাদের। তেমনই আরেকজন আশা বেগম (ছদ্মনাম)। তারও স্বপ্ন ছিল চলচ্চিত্রে অভিনয় করা। তার এক চাচাতো ভাই এফডিসিতে কাজ করতেন। তার হাত ধরেই সিনেমায় প্রবেশ।

ক্যারিয়ারের প্রথম সিনেমাতেই এক্সট্রা আর্টিস্ট হিসেবে অভিনয় করেছিলেন বর্তমান সময়ের একজন সুপারস্টারের সঙ্গে। সেদিন থেকেই তার চিন্তা-ভাবনা বদলে যেতে থাকে।

সামনে যে প্রতারণার বিশাল জাল, সেটা ঠিক বুঝতে পারেননি আশা। সেই চাচাতো ভাই তাকে বেশি টাকা আয়ের লোভ দেখাতে শুরু করেন। একই সঙ্গে নায়িকা বানিয়ে দেওয়ার স্বপ্নও দেখান।

‘কাজটা বেশি কঠিন নয়, শুধু কিছু নির্দিষ্ট মানুষের মনের খোরাক জোগাতে হবে। তা হলেই অনেক টাকা পাওয়া যাবে’, বলেন আশা।

সূত্র: প্রিয়.কম। 

Leave a Reply

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

May 2018
S M T W T F S
« Apr   Jun »
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
%d bloggers like this: