চট্টগ্রাম, রোববার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯

১০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও জামায়াত নেতারা

প্রকাশ: ২০১৮-০৫-২১ ১৪:৩৯:৫৪ || আপডেট: ২০১৮-০৫-২১ ১৪:৩৯:৫৪

মিরসরাই উপজেলায় গ্রাহকের অন্তত ১০ কোটি টাকা নিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছে জামায়াত নেতাদের পরিচালিত মারূফ ফাউন্ডেশন। মিরসরাই সদরের নিলয় শপিং সেন্টারে একটি অফিস ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে ওই টাকা সংগ্রহ করে তারা। প্রায় দেড় বছর ধরে অফিসে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন কর্মকর্তারা। এতে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত গ্রাহকরা প্রতিদিনই অফিসটির সামনে ভিড় করছেন। একাধিক গ্রাহক অভিযোগ করেন, টাকার জন্য মারূফ অফিসে কাউকে না পেয়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায় থাকা কর্মকর্তাদের ফোন দিলেও তারা রিসিভ করেন না। অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকলেও অনেককে ইসলামী ব্যাংক মিরসরাই শাখার চেক দেওয়া হয়। টাকা আদায় করতে না পেরে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মিরসরাই পৌরসভায় কয়েক গ্রাহক অভিযোগ দিয়েছেন।

পৌরসভার মেয়র এম গিয়াস উদ্দিন জানান, তার কার্যালয়ে কয়েকটি লিখিত অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের কয়েকবার নোটিশ দিলেও তারা কার্যালয়ে হাজির হননি। লিখিত অভিযোগ ছাড়াও অর্ধশতাধিক গ্রাহকের মৌখিক অভিযোগ আছে। আগের অভিযোগগুলোর টাকা আদায় করতে না পারায় নতুন অভিযোগ তিনি নিচ্ছেন না। প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকের হাতিয়ে নেওয়া কোটি কোটি টাকা ফেরত দিতে পারবে কি-না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি।

১৯৯৮ সালে উপজেলা জামায়াতের ১৫ সদস্য সংগঠিত হয়ে ‘মিরসরাই রুরাল অ্যান্ড আরবান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন (মারূফ)’ নামে ওই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। উপজেলা জামায়াতের রুকন খায়রুল ইসলাম মারূফের নেতৃত্বে মোহাম্মদ রেজাউল করিম, নুরুল আবছার, আবদুল মোতালেব, আবুল বশর, নুরুল কবির, রেজাউল করিম নিজামীসহ ১৮ জামায়াত নেতা এটি গড়ে তুলতে কাজ করেন। কাগজপত্রে সংগঠনের উদ্দেশ্য হিসেবে এতিম, অসহায়, প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ ৩১টি কর্মসূচি দেখানো হয়। প্রায় ২০০ জামায়াত নেতাকর্মী নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে গ্রাহক সংগ্রহ করা হয়। কর্মীরা গ্রাহককে ১৮ থেকে ২০ শতাংশ লাভের লোভ দেখিয়ে মারূফ রিসোর্স কর্মসূচির নামে মাসিক ও এককালীন অর্থ সংগ্রহ করেন। ওই অর্থ দিয়ে প্রথমদিকে কর্মকর্তারা জমি কেনাবেচা ব্যবসা শুরু করেন। ২০০৪ সালে সংগঠনটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানির নিবন্ধন করে। নিবন্ধনকালে এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ রেজাউল করিম। ২০০৪ সালের পর তারা রিয়েল এস্টেট, মৎস্য, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ বিভিন্ন প্রকল্প দেখিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করেন। ২০০৮ সালে কর্মকর্তাদের মধ্যে রাজনীতিক ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে খায়রুল ইসলাম মারূফসহ একটি অংশ প্রতিষ্ঠান থেকে সরে যায়। এরপর থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের দায়িত্ব থাকা জামায়াত নেতারা যে যার মতো গ্রাহকদের অর্থ নিজের করে নিতে থাকেন। ২০০৯-১০ সালের দিকে গ্রাহকদের সঞ্চিত টাকা ফেরত দিতে গিয়ে বিপাকে পড়েন তারা। ২০১২ সালে ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনকে চেয়ারম্যান করে ‘মারূফ ফাউন্ডেশন’ নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করা হয়। ট্রাস্টের অন্য সদস্যরা হলেন- ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রেজাউল করিম, নুরুল আবছার, সেক্রেটারি সাইফ উদ্দীন মীর শাহীন, ট্রেজারার আবদুল মোতালেব, সদস্য আবুল বশর, মীর হোসেন, একরামুল হক ও নুরুন নবী। এদের সবার ঠিকানা দেখানো হয়েছে নিলয় শপিং কমপ্লেক্স, মিরসরাই। বর্তমানে তারা নিজেদের আড়ালে রেখেছেন।

বৃহস্পতিবার নিলয় শপিং কমপ্লেক্সে মারূফ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, রাহেলা আক্তার নামে এক অফিস সহকারী বসে  আছেন। গ্রাহকের পাওনা দিতে না পারার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, সংগঠনে প্রায় ৭ হাজার গ্রাহকের লেনদেন রয়েছে। গ্রাহকরা টাকার জন্য ভিড় জামানোয় কর্মকর্তারা এখন আর অফিসে আসেন না।

গ্রাহক জরিনা আক্তার জানান, তিনি একাকালীন ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা জমা করেছিলেন। গত দুই বছর ধরে মারূফের কর্মকর্তা ও পরিচালকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও টাকা আদায় করতে পারেননি। কর্মকর্তাদের গা-ঢাকার বিষয়টি জানালেন মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম ও আকলিমা আক্তার নামে আরও তিন গ্রাহক। শ্যামল কান্তি শর্মা নামে একজন বলেন, লাভ তো দূরে থাক, এখন আসল টাকা নিয়েই দুশ্চিন্তায় পড়েছি। গ্রাহক হারুন অর রশিদ বলেন, অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকলেও আমাকে ইসলামী ব্যাংকের চেক দেওয়া হয়।

মারূফ সংগঠনের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন একজন বলেন, সংগঠনের মৎস্য প্রকল্প, মারূফ স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও কিছু জমি ছাড়া বর্তমানে আর কিছুই নেই। গ্রাহকদের যে পরিমাণ টাকা সংগঠনের কাছে রয়েছে, বর্তমানে গচ্ছিত সম্পত্তিগুলো দিয়েও সে টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। রেজাউল করিম নিজামী নামে এক কর্মকর্তা জানান, মারূফের নামে থাকা জায়গা বিক্রি করতে না পারায় গ্রাহকের টাকা দেওয়া যাচ্ছে না। অনেককে চেক দিয়ে রাখা হয়েছে। তার হিসাবে গ্রাহকের পাওয়া হবে ১০-১২ কোটি টাকা। তিনি দাবি করেন, তবে প্রতিষ্ঠানটি এক টাকাও মেরে খাবে না। ক্রমান্বয়ে গ্রাহকের সব টাকা ফেরত দেবে।

উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা দিপক দাস বলেন, মারূফ ফাউন্ডেশন সমবায় অফিস থেকে কোনো অনুমোদন নেয়নি। নিলয় শপিং সেন্টারের ভবন মালিক মো. মনিরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, মারূফ তাদের ভবনে অফিস ভাড়া নিলেও এক বছর ধরে ভাড়া পরিশোধ করেনি। ভাড়া চাওয়ায় মারূফ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান জামায়াত নেতা ইঞ্জিনিয়ার গিয়াস উদ্দিন সন্ত্রাসী দিয়ে তাকে আক্রমণ করেন। পরে তিনি জিডি করেন।

মারূফ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রেজাউল করিমের ফোনে কল দিলে এক নারী রিসিভ করে দাবি করেন, এটি করিমের নম্বর না। অন্য আরও দুটি নম্বরে ফোন দিলেও বন্ধ পাওয়া যায়।

মারূফ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও মারূফ ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার গিয়াস উদ্দিন বলেন, মারূফ ট্রাস্ট বলতে আমি মারূফ স্কুল অ্যান্ড কলেজটা দেখাশোনা করি। মারূফের অন্য প্রকল্পগুলো ভুল পরিচালনার কারণে গ্রাহকের পাওনা তারা দিতে পারছে না। আমার কাছেও গ্রাহকদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন। পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলে দেখি কিছু করা যায় কি-না।

সূত্র: সমকাল।

Leave a Reply

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

May 2018
S M T W T F S
« Apr   Jun »
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
%d bloggers like this: