চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮

‘আমি হার মানবো না, মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাবোই’

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-২৮ ১৭:৪৮:১৭ || আপডেট: ২০১৮-০৪-২৮ ১৭:৫১:৫৬

‘ক্লাস নাইন থেকে রিকশা চালাই। ২০১৬ সালে অনার্স ও ২০১৮ সালে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছি। চাকরির জন্য যেখানে যাই সেখানেই ঘুষ চায়। মেয়র প্রার্থীরা, আপনারা নির্বাচিত হলে আমার কি চাকরি হবে? ঘুষ ছাড়া আমার কি একটি চাকরির ব্যবস্থা করতে পারবেন?’

শনিবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের নিয়ে আয়োজিত জনগণের মুখোমুখি অনুষ্ঠানে দর্শক সারি থেকে এমন প্রশ্ন ছোড়েন রিকশাচালক এনামুল হক। খুলনার শহীদ হাদিস পার্কে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

এনামুলের ভাষ্যে, রিকশা চালিয়েই খুলনার সরকারি বিএল কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ২০১৮ সালে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছেন তিনি। অনুষ্ঠানে তার এমন প্রশ্নে মেয়র প্রার্থীরা বিস্ময়ে পড়ে যান। উপস্থিত হাজারো জনতা খানিকটা থমকে গেলেও তুমুল করতালিতে তার প্রশ্নের সাধুবাদ জানান।

অনুষ্ঠানে ছিলেন কেসিসি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক, বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জাতীয় পার্টির প্রার্থী এস এম শফিকুর রহমান, ইসলামী আন্দোলনের মেয়র প্রার্থী মাওলানা মোজাম্মেল হক ও কমিউনিস্ট পার্টির মেয়র প্রার্থী মিজানুর রহমান বাবু। তারা খুলনার উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দেন অনুষ্ঠানে। কিন্তু এনামুলের ‘ঘুষ ছাড়া চাকরি’র বিষয়ে কারও বক্তব্য মেলেনি।

এনামুল জানান, তিনি রিকশা চালিয়েই এ অনুষ্ঠানে এসেছেন। বাইরের রাস্তায় রিকশা রেখে এমন প্রশ্নের উত্তর পেতে অনুষ্ঠানে এসেছেন। অনুষ্ঠান শেষে জীবন সংগ্রামের লড়াকু এনামুল বাংলানিউজকে জানান, ১৯৯৮ সালে যশোরের কেশবপুর উপজেলার মঙ্গলকোট শহীদ খালেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তার জীবন যুদ্ধ শুরু। কখনও বাদাম কখনও আখ বেচে টাকা আয় করে নিজের পড়াশোনার খরচ বহন করতেন। খেয়ে না খেয়েও পড়াশোনা চালিয়েছেন।

শত প্রতিকূলতার মাঝেও শিক্ষা সংগ্রামে সাহসী এ যুবক বলেন, ‘সারাদিন রিকশা চালিয়ে বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। জানি না কী হবে। বিসিএস না হলে ব্যাংকার বা কলেজের শিক্ষক হতে চাই। কিন্তু চিন্তা একটাই। চাকরির পরীক্ষায় পাস করার পরও সবাই ঘুষ চায়।’

রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়ে জীবনের ভাগ্য বদলাতে আশাবাদী এনামুল বলেন, ‘জীবনে যত কষ্ট হোক না কেন আমি হার মানবো না। মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাবোই।’

অনেকটা আপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, ‘বাবার ওপর অভিমান করে খুলনা এসেছিলাম। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা বলেছিলেন, শুধু পড়াশোনা করলেই চলবে না, সংসারের খরচও চালাতে হবে। তখন থেকে খুলনায় এসে রিকশা চালিয়ে নিজের খরচ বহন করে পরিবারেও টাকা পাঠাই।’

২০১২ সালে নিজে রিকশা কেনেন এনামুল। তার রিকশায় লেখা আছে ‘মো. এনামুল হক, সরকারি বিএল কলেজ’। রিকশা চালিয়ে ছোট বোনের বিয়ে দিয়েছেন। তার খরচেই ছোট ভাই বিএল কলেজে মার্কেটিংয়ে তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। মা কিডনি ও ডায়বেটিস রোগে আক্রান্ত। তার পেছনে মাসে ৫ হাজার টাকার প্রয়োজন হয়। এসব খরচ চালাতে প্রায় দেড় লাখ টাকা দেনা হয়েছে তার।

এনামুল জানান, নগরীর ১৬ নং ওয়ার্ডের বয়রা এলাকার একটি মেসে থাকেন তিনি। হতদরিদ্র কৃষক বাবা ফজলুর রহমানের পক্ষে সংসারের এতো খরচ বহন করা সম্ভব না হওয়ায় ছোট বেলা থেকেই তাকে নামতে হয় জীবন সংগ্রামে। এই সংগ্রাম শেষ হবে শিগগির, সে আশায় দিন গুজরান তার।

Leave a Reply

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

April 2018
S M T W T F S
    May »
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  
%d bloggers like this: