চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ২০ জুলাই ২০১৮

ঐতিহ্যে মোড়ানো জব্বারের বলীখেলার ১০৯তম আসর কাল

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-২৪ ০৩:৫০:৪২ || আপডেট: ২০১৮-০৪-২৪ ০৩:৫০:৪২

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলী খেলার ১০৯তম আসর বসছে বুধবার (২৫ এপ্রিল)। লালদিঘী মাঠে বলী খেলা আয়োজনের সকল প্রস্তুতি ইতিমধ্যে ৭০ শতাংশ সম্পন্ন করেছে আয়োজকরা। বলী খেলা ছাড়াও প্রতিবছরের মতো এবারো বসছে ৩ দিন ব্যাপী বৈশাখী মেলা। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বলী খেলায় প্রতিবছর সারা দেশ থেকে নামকরা বলীরা অংশ নেয়। নগদ টাকা ছাড়াও বিভিন্ন পুরস্কার প্রদান করা হয় বিজয়ীদের মাঝে। আর এ বলী খেলা দেখতে বৃহত্তর চট্টগ্রাম থেকে লাখো মানুষে ভীড় জমে লাল দিঘী ময়দানে। প্রসঙ্গত, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য ১৯০৯ সালে লালদীঘির মাঠে এ বলীখেলার আয়োজন করেছিলেন বদরপাতির আবদুল জব্বার সওদাগর। পরবর্তী সময়ে এটি জব্বারের বলী খেলা নামেই পরিচিত।

সরেজমিনে দেখা গেছে, লালদিঘী ময়দানের আশে পাশে হাজারো ছোট বড় ভ্রাম্যমান দোকান বসিয়েছে বিক্রেতারা। গৃহস্থলির কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রসামগ্রীই বেশি আনা হয়েছে ভ্রাম্যমান এসব দোকানে। ফারুক নামের এক দোকানদার জানান, দা-বঁটি, শীতলপাটি, ফুলঝাড়–, হাতপাখাসহ ব্যবহৃত জিনিসপত্র বিক্রির জন্য এনেছেন তারা। মেলা ৩ দিনে হলেও মেলাটি ৫-৬দিন পর্যন্ত চলে। মেলা আনা পণ্যগুলোর মূল্যও কিছুটা ছাড় দিয়ে বিক্রি করে তারা। এ মেলায় প্রতিবছর পণ্য বিক্রির জন্য আসেন তারা।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ভারতবর্ষের স্বাধীন নবাব টিপু সুলতানের পতনের পর এই দেশে বৃটিশ শাসন শুরু হয়। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ এবং একই সঙ্গে বাঙালি যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলা এবং শক্তিমত্তা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের মনোবল বাড়ানোর উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামের বদরপতি এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর বলী খেলা বা কুস্তি প্রতিযোগিতার প্রবর্তন করেন। ১৯০৯ সালের ১২ বৈশাখ নিজ নামে লালদীঘির মাঠে এই বলীখেলার সূচনা করেন তিনি। ব্যতিক্রমধর্মী ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োাজনের জন্য ব্রিটিশ সরকার আবদুল জব্বার মিয়াকে খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও বার্মার আরাকান অঞ্চল থেকেও নামী-দামি বলীরা এ খেলায় অংশ নিতেন।

আরো জানা যায়, কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদীর মধ্যবর্তী স্থানের উনিশটি গ্রামে মল্ল উপাধিধারী মানুষের বসবাস ছিল। প্রচণ্ড দৈহিক শক্তির অধিকারী মল্লরা সুঠামদেহী সাহসী পুরুষ এবং তাদের বংশানুক্রমিক পেশা হচ্ছে শারীরিক কসরৎ প্রদর্শন। এই মল্লবীরেরাই ছিলেন বলিখেলার প্রধান আকর্ষণ ও বলিখেলা আয়োজনের মূল প্রেরণা। চট্টগ্রামের বাইশটি মল্ল পরিবার ইতিহাস প্রসিদ্ধ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এখন পেশাদার বলির (কুস্তিগীর) অভাবে বলিখেলার তেমন আকর্ষণ না থাকলেও জব্বারের বলীখেলার মূল উপজীব্য হয়ে উঠেছে মেলা। তাই অনেকে বলীখেলার পরিবর্তে একে বৈশাখী মেলা হিসেবেই চিনে। জব্বার মিয়ার বলী খেলা ও বৈশাখী মেলা চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অহংকারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় লোকজ উৎসব হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করা হয়। খেলাকে কেন্দ্র করে তিন দিনের আনুষ্ঠানিক মেলা বসার কথা থাকলেও কার্যত পাঁচ-ছয় দিনের মেলা বসে লালদীঘির ময়দানের চারপাশের এলাকা ঘিরে।
জব্বারের বলী খেলার পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্থানে যেমন কক্সবাজারে ডিসি সাহেবের বলী খেলা, সাতকানিয়ায় মক্কার বলী খেলা, পটিয়ায় আমজু মিয়ার বলী খেলা, আনোয়ারায় সরকারের বলী খেলা, রাউজানে দোস্ত মোহাম্মদের বলী খেলা, হাটহাজারীতে চুরখাঁর বলী খেলা, চান্দগাঁওতে মৌলভীর বলী খেলা এখনও কোনরকমে বিদ্যমান।

বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অনুপম সেন বলেন, ‘১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর এ প্রতিযোগিতার সূচনা করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর এ প্রতিযোগিতা জব্বারের বলীখেলা নামে পরিচিতি লাভ করে। বাঙালি সংস্কৃতি লালনের পাশাপাশি বাঙালি যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলা এবং শক্তিমত্তা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের মনোবল বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই আবদুল জব্বার সওদাগর এই বলীখেলার প্রবর্তন করেন।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন জানান, দেশের কুটির শিল্পকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এ মেলা। প্রতিবছর ১২ বৈশাখ জব্বারের বলীখেলা হলেও তিন দিনের লোকজ মেলা শুরু হয় ১১ বৈশাখ থেকে। নিত্যব্যবহার্য ও গৃহস্থালি পণ্যের প্রতিবছরের চাহিদা এ মেলাতেই মেটান চট্টগ্রামের গৃহিণীরা। কারণ হাতপাখা, শীতলপাটি, ঝাড়ু, মাটির কলস, মাটির ব্যাংক, রঙিন চুড়ি, ফিতা, হাতের কাঁকন, বাচ্চাদের খেলনা, ঢাকঢোল, মাটি ও কাঠের পুতুল, বাঁশি, তৈজসপত্র, আসন, চৌকি, খাট, আলমারি, ফুলদানি, তালপাখা, টব, হাঁড়ি-পাতিল, দা-ছুরি, কুলা-চালুন, টুকরি, পলো, বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা, মুড়ি, মুড়কি, লাড্ডু, জিলাপি সবই মেলে এ মেলায়।

চট্টগ্রামকে বলা হয় বীরের শহর। বলী থেকেই এই বীর উপাধি পেয়েছে চট্টগ্রামবাসী। সাধারণভাবে প্রচলিত আছে এখানকার মানুষ দৈহিকভাবে শক্তিশালী। কারণ কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদীর মধ্যবর্তী স্থানের উনিশটি গ্রামে মল্ল বা পালোয়ান উপাধিধারী মানুষের বসবাস ছিল। চট্টগ্রামের বাইশটি মল্ল পরিবারের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাসও। পটিয়ার আশিয়া গ্রামের আমান শাহ মল্ল, আনোয়ারা চাতরি গ্রামের চিকন মল্ল, বাঁশখালীর কাতারিয়া গ্রামের চান্দ মল্ল, জিরি গ্রামের ঈদ মল্ল ও নওয়াব মল্ল, পারি গ্রামের হরি মল্ল, পেরলা গ্রামের নানু মল্ল, পটিয়ার হিলাল মল্ল ও গোরাহিত মল্ল, হাইদগাঁওর অলি মল্ল ও মোজাহিদ মল্ল, শোভনদণ্ডীর তোরপাচ মল্ল, কাঞ্চননগরের আদম মল্ল, ঈশ্বরখাইনের গনি মল্ল, সৈয়দপুরের কাসিম মল্ল, বোয়ালখালী পোপাদিয়ার যুগী মল্ল, খিতাপচরের খিতাপ মল্ল, ইমামচরের ইমাম মল্ল, নাইখাইনের বোতাত মল্ল, মাহাতার এয়াছিন মল্ল, হুলাইনের হিম মল্ল, গৈরলার চুয়ান মল্ল। প্রচণ্ড দৈহিক শক্তির অধিকারী মল্লরা সুঠামদেহী সাহসী পুরুষ। বংশানুক্রমিকভাবে এদের পছন্দ শারীরিক কসরত প্রদর্শন। এই মল্লবীরেরাই ছিলেন বলীখেলার প্রধান আকর্ষণ। ছিলেন বলীখেলা আয়োজনের মূল প্রেরণাও।

নানা বর্ণিল আয়োজনে বর্ষবরণ ও বর্ষ বিদায়ের জন্য প্রস্তুত হয় বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। এবারও নতুন বর্ষকে বরণ করতে লোকজ নানা উৎসব বসবে চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এসব উৎসবে থাকবে কাবাডি, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগ লড়াই, পুতুল নাচ, সাপের খেলা, ঘুড়ি উৎসবসহ নানা অনুষ্ঠান। কালের বিবর্তনে অনেক খেলা-মেলা হারিয়ে গেলেও বৈশাখকে ঘিরে আবার বসবে প্রাণের মেলা।

এদিকে লালদিঘী ময়দানের একপাশে জোরেশোরে চলছে বলী খেলার ৪শ বর্গফুটের একটি মঞ্চ তৈরির কাজ। মঙ্গলবার সকালে এ মঞ্চের কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। ২০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২০ ফুট প্রস্থের মঞ্চটি মাঠ থেকে ৫ ফুট উচ্চতা থাকবে। মঞ্চের উপরে থাকবে ৮ ইঞ্চি মাঠি। সাধারণ মানুষ যাতে মঞ্চে ভিড়তে না পারে সেজন্য দেয়া হচ্ছে প্রতিরোধক ভাউন্ডারি।

বলী খেলার সর্বশেষ প্রস্তুতি নিয়ে প্রতিবেদকের সাথে কথা হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আন্দরকিল্লা ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আয়োজক কমিটির আহবায়ক জহর লাল হাজারীর সাথে। তিনি জানান, ইতিমধ্যে ৭০ শতাংশ প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। জুরেসুরে চলছে বলী খেলার মঞ্চ তৈরির কাজ। এবারের বলী খেলার স্লোগান রাখা হয়েছে ‘মাদকমুক্ত যুবসমাজ’। প্রতিবছরের ন্যয় এবারো তালিকাভুক্ত এক’শ বলী থেকে যাছাই বাচাই করে ৫০ জনকে খেলানো হবে। সেখান থেকে প্রতিযোগীতার মাধ্যমে সেমি ফাইনাল ও ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে। সর্বমোট ৫০জন বলীকে পুরস্কৃত করা হবে বলেও তিনি জানান।

তিনি আরো বলেন, বলী খেলার উদ্বোধন করবেন চ্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার, প্রধান অতিথি থাকবেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। বিশেষ অতিথি থাকবেন বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশন্স লিমিটেড এর রিজিওনাল ডিরেক্টর সৌমেন মিত্র। এ আয়োজন সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করতে তিনি সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

সিটিজি টাইমস২৪.কম/একে

Leave a Reply

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

April 2018
S M T W T F S
    May »
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  
%d bloggers like this: